ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ফেড চেয়ারম্যানের বিরোধ

ওয়াল স্ট্রিটে প্রধান প্রধান শেয়ারসূচকে পতন

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলের বিরুদ্ধে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আইনি পদক্ষেপ হুঁশিয়ারি দেয়ার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলের বিরুদ্ধে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আইনি পদক্ষেপ হুঁশিয়ারি দেয়ার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে। ২০২৬ সালের জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহের শুরুতে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। ফেড ও হোয়াইট হাউজের মধ্যকার এ স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাবে নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের ফিউচার সূচকগুলো বড় পতনের মুখে পড়েছে। এমনকি ইউরোপের শেয়ারবাজারেও দেখা গেছে এ-সংক্রান্ত উদ্বেগের ছাপ। তবে বিপরীত চিত্র এশিয়া প্যাসিফিকের শেয়ারবাজারে। চীনের নতুন অর্থনৈতিক প্রণোদনার খবরে চাঙ্গা ভাব দেখা গেছে এশিয়ার প্রধান শেয়ারসূচকগুলোয়। খবর রয়টার্স ও এপি।

ফেড চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল গতকাল জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সদর দপ্তর সংস্কার নিয়ে তাকে ফৌজদারি মামলার হুমকি দেয়া হয়েছে। মার্কিন বিচার বিভাগ (ডিওজে) এরই মধ্যে তার কাছে এ সংক্রান্ত সমন পাঠিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের শুরুতেই মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি গোটা বিশ্বেই বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে।

পাওয়েল বলেন, ‘ফেডের সদর দপ্তরে ২৫০ কোটি ডলারের সংস্কার কাজকে কেবল একটি অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফেডকে চাপে রেখে সুদহার কমিয়ে আনাই পদক্ষেপটির মূল উদ্দেশ্য। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আসা হুমকি ও চলমান চাপের অংশ হিসেবেই এমন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।’

উল্লেখ্য, ফেড চেয়ারম্যান হিসেবে পাওয়েলের বর্তমান মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী মে মাসে। তবে এর আগেই ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তার প্রকাশ্য বিরোধ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

পাওয়েলের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের খবরে ওয়াল স্ট্রিটে লেনদেনের শুরুতেই নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যায়। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচার সূচক কমেছে দশমিক ৭ শতাংশ। এছাড়া ডাও জোনস ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ ফিউচার দশমিক ৬ শতাংশ এবং নাসডাক কম্পোজিট সূচক ১ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে।

বাজার পর্যবেক্ষকদের মতে, বিনিয়োগকারীরা এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সিদ্ধান্তের চেয়ে হোয়াইট হাউজের রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে বেশি চিন্তিত।

মিৎসুবিশি ইউএফজে ফাইন্যান্সিয়াল গ্রুপের (এমইউএফজি) মুদ্রা কৌশলবিদ লি হার্ডম্যান বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ফেড চেয়ারম্যান পাওয়েলের মধ্যকার এ বিরোধ একটি বিপজ্জনক উচ্চতায় পৌঁছেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতায় বারবার আক্রমণ ডলারের ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।’

ওয়াল স্ট্রিটের প্রধান প্রধান সূচকে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেলেও গতকাল এশিয়া-প্যাসিফিকের শেয়ারবাজারে ছিল ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা। হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ২৬ হাজার ৬০৮ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। চীনের সাংহাই কম্পোজিট সূচক ১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে পৌঁছেছে ৪ হাজার ১৬৫ পয়েন্টে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, চীনের মন্থর অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে নীতিনির্ধারকরা নতুন বড় ধরনের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে পারেন। এমন খবরে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে উৎসাহিত হওয়ায় এশিয়ার শেয়ারবাজারে চাঙ্গা ভাব দেখা দিয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ৪ হাজার ৬২৪ দশমিক ৭৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার এসঅ্যান্ডপি/এএসএক্স ২০০ সূচক দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৮ হাজার ৭৫৯ দশমিক ৪০ পয়েন্টে পৌঁছেছে। এছাড়া তাইওয়ানের তাইএক্স সূচকেও দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। তবে ছুটির কারণে জাপানের টোকিও স্টক এক্সচেঞ্জ গতকাল বন্ধ ছিল।

ফেড ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যকার এ দ্বন্দ্বের প্রভাব পড়েছে ইউরোপের শেয়ারবাজারেও। জার্মানির ডিএএক্স সূচক প্রায় স্থিতিশীল থাকলেও ফ্রান্সের সিএসি ৪০ সূচক দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। এছাড়া লন্ডনের এফটিএসই ১০০ সূচক কমেছে দশমিক ১ শতাংশ।

এদিকে মুদ্রাবাজারে ডলারের বিনিময় হার কমেছে। প্রধান মুদ্রাগুলোর বিপরীতে ডলার ইনডেক্স দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে, যা গত ডিসেম্বরের পর একদিনে সর্বোচ্চ পতন। ডলারের বিপরীতে ইউরোর বিনিময় হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ ডলার ১৬ সেন্টে। এছাড়া জাপানি ইয়েন ও সুইস ফ্রাঁর বিপরীতেও ডলারের বিনিময় কমেছে।

ন্যাশনাল অস্ট্রেলিয়া ব্যাংকের (এনএবি) মুদ্রা কৌশল প্রধান রে অ্যাট্রিল বলেন, ‘ফেড ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে উন্মুক্ত এ যুদ্ধ ডলারের ভাবমূর্তির জন্য কোনোভাবেই ভালো সংকেত নয়।’

২০২৬ সালের শুরুতেই ভেনিজুয়েলা ও গ্রিনল্যান্ড ইস্যু নিয়ে তৈরি হওয়া ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্ববাজারে আগে থেকেই চাপ তৈরি করে রেখেছিল। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ফেড নিয়ে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা এখন আজ প্রকাশিতব্য মার্কিন মূল্যস্ফীতির তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছেন। এছাড়া চলতি সপ্তাহেই জেপিমরগান চেজ ও বিএনওয়াইয়ের মতো বড় ব্যাংকগুলোর আয়ের প্রতিবেদন প্রকাশের কথা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, মার্কিন বিচার বিভাগের তদন্ত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে সেটি কেবল শেয়ারবাজার নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে দেবে।

আরও